নতুন জীবন
আকাশ একজন বাপ-মা মারা যাওয়া শিশু। এর বাড়ি ওর বাড়ি ঘুরে ঘুরে খায়। আবার তাদের বাড়ির টুকটাক কাজ করেদিলে একমুঠো খাওয়ার দেয়, নয়তো না। রাস্তায় ঘুরেবেড়াতে দেখে কেউ যদি দয়া মনে কিছু দেয় তবে খায়। বাবা-মা মারা যান আকাশের যখন পাঁচ বছর বয়স, গাড়ী একসিডেন্ট। তার পরিবারে আর কেউ নেই। মামাবাড়ি থাকলেও দিদা দাদু মারা গেছেন। মামা-মামি আছেন, কিন্তু তারা আকাশকে রাখতে চায়না। তাই আকাশের এমন অবস্থা। ওর একটা বাড়ি আছে তাতেই থাকে। একদিন এক অফিসার বাড়ি ভাড়া নেওয়ার জন্য বাড়ি খুঁজছিলেন, এমন সময় ওই অফিসারের চোখে পড়ে একটা শিশু একজনের বাড়ির জল তুলছে। এত ছোট বাচ্চাকেএমন কাজ করতে দেখে ওই অফিসার একটু অবাক হলেন। তারপর ওই অফিসার সবকিছু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে কিছুক্ষন পর ওই শিশুটাকে কাছে ডাকলো। শিশুটি কাছে আসতে লোকটি তাকে জিজ্ঞাসা করলো, তোমার নাম কি? উত্তরে ছেলেটি বলল আকাশ। লোকটি ঘুরে বলল বাড়ি কোথায় তোমার? ছেলেটি আঙ্গুল বাড়িয়ে বলল, ওইখানে। লোকটি তখন ছেলেটিকে বলল, তাহলে তুমি এই বাড়িতে জল তুলছো কেন? তখন ছেলেটি বলল, আমি জল বয়ে দিলে ওনারা খেতে দেবে, নাহলে না। আর খাবার না খেলে আমার খুব খিদে পায়, কষ্ট হয়। তখন লোকটি জিজ্ঞাসা করলো, তোমার মা-বাবা কোথায়? ছেলেটি উত্তরে বলল, নেই। লোকটি বলল, নেই মানে? ছেলেটি বলল, আকাশের তারা হয়ে গেছে আমার মা-বাবা। ছেলেটির এমন কথা শুনে লোকটির চোখে জল এল। তারপর আকাশের ব্যাপারে আশেপাশের মানুষজনের কাছ থেকে সবকিছু জানল। এরপর আকাশকে নিয়ে আকাশের বাড়িতে গেল। দেখল একতলা ইটের বাড়ি, তেমন ছিমছাম নয়, তবে ভালোভাবে থাকা যাবে। আকাশের জন্মের পরে তারপর ওর বাবা এই বাড়িটি করেছিল। তারপর আর বড় করা হয়নি। অফিসারটি আকাশকে বলল, আমি কি তোমার সঙ্গে এই বাড়িতে থাকতে পারি। তোমাকে আমি পড়াশোনা করাবো, আর লোকের বাড়ি কাজ করে খেতে হবে না। ছেলেটি তখন খুশি হয়ে বলল, সত্যি? লোকটি বলল, হ্যাঁ। ছেলেটি তখন আনন্দে নাচতে নাচতে বলল, 'ইয়ে, কি মজা, আজ থেকেই আংকেল আমার সঙ্গেই থাকবে।' তখন লোকটি বলে উঠল, আমার সঙ্গে আরও এখন থাকবে। কথাটা শুনে আকাশ চমকে গেল। আকাশের মুখটা ভয়ে কালো হয়ে উঠলো। লোকটি বলল ভয় নেই, উনি খুব ভালো মানুষ, উনি আমার স্ত্রী। উনিও তোমায় খুব ভালোবাসবেন। তখন ছেলেটি আবার আনন্দে লাফিয়ে উঠলো। লোকটি ছেলেটির এমন কান্ড দেখে আনন্দে কেঁদে ফেলল। পরের দিন লোকটির স্ত্রী সমস্ত জিনিসপত্র নিয়ে চলে এলো। এসে দেখে তার স্বামীর কাছে একটি বাচ্চা দাঁড়িয়ে, মায়াবী মুখ। উনি ভাবতে লাগলেন, এই সেই আকাশ, যার কথা কাল উনি ফোনে বলেছিলেন। তারপর সমস্ত জিনিসপত্র ফেলে দিয়ে ছুটে এসে আকাশকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন এবং আদর করতে লাগলেন। এই কান্ড দেখে লোকটির চোখে জল। কিন্তু আকাশ কিছু বুঝতে পারছে না। আসলে ওই দম্পতির আট বছর হল বিবাহিত জীবন, কিন্তু কোন সন্তান নেই। ডাক্তার বলে দিয়েছেন, ওই দম্পতির কোন সন্তান হবে না কোনোদিন। তাই আকাশকে দেখে এমন করছে। আকাশকে নিয়ে তাদের সংসার নতুন করে সাজাবে আবার। এইসব ভেবেই দুজনের চোখে জল। লোকটি তার স্ত্রীকে বলল, দেখেছো, কে বলেছে আমাদের সন্তান নেই, আজ থেকে এ আমাদের সন্তান। লোকটির স্ত্রী আকাশকে বলল, আজ থেকে তুই আমাদের বাবা-মা বলে ডাকবি। এই শুনে আকাশ বলল, কিন্তু আমার বাবা-মা যে মারা গেছে। তখন তারা বলল, কে বলেছে, এই তো আমরা তোর বাবা-মা আজ থেকে। আর যা হয়েছে সব ভুলে যা। আজ থেকে আমরা তিনজন বাবা-মা-ছেলে মিলে একসঙ্গে থাকবো। দেখতে দেখতে কয়েকটা দিন কাটল। আকাশকে তার নতুন বাবা-মা স্কুলে ভর্তি করেছে। সে স্কুলে যায়, বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে খেলা করে, এসে তার মায়ের কাছে পড়তে বসে। তার মা তাকে খুব ভাববাসে। খাইয়ে-দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দে, স্কুলে ছেড়ে দিয়ে আসে। আকাশ এখন অন্যান্য বাড়ির বাচ্চাদের মতো ভালো জামা-কাপড়, জুতো পরে, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকে। খাওয়া-দাওয়া ঠিকঠাকের কারণে শরীরের উন্নতি হয়েছে। অন্যান্য বাবাদের মতো তার বাবা প্রত্যেকদিন অফিস থেকে আসার সময় তার জন্য চকলেট, বিস্কুট, চিপস বিভিন্ন রকমের খাবারের জিনিস আনে। অনেক খেলনাও এনে দিয়েছে, যা দিয়ে আকাশ খেলাধুলা করে। আকাশের জীবন এখন পাল্টে গেছে। আর তার নতুন বাবা-মার্ আকাশকে নিয়ে হাজারো স্বপ্ন। আকাশের বাবা ওই বাড়িটাকে বড় করে বানাচ্ছে। নতুন আসবাবপত্রে ওই পুরোনো বাড়িটাও নতুন করে সেজে উঠেছে। দেখতে দেখতে আরো বারোটা বছর পার হল। আকাশের বয়স কুড়ি বছর। উচ্চ-মাধ্যমিক দিয়েছে, সে ডাক্তারি পড়তে যাবে। আকাশের স্বপ্ন সে একজন ভালো ডাক্তার হয়ে গরিব মানুষের চিকিৎসা করবে। তার বাবা-মা আকাশের ওপর কোনোরকম জোর করেনি, আকাশ যা হতে চায়, তাই হবে। আকাশ ডাক্তারি পড়তে বিদেশ গেল। এদিকে তার বাবা-মায়ের কষ্ট হচ্ছে আকাশকে ছাড়া থাকতে। প্রতিদিন আকাশের সাথে ফোনে ভিডিও কলে কথা হয়, তাও আকাশেরও তাদের ছাড়া থাকতে কষ্ট হয়। কিন্তু তার বাবা-মা কে বোঝায় কষ্ট পেয়ো না, এই কয়টা বছর দেখতে দেখতে কেটে যাবে। সত্যি সত্যিই আরো কয়েকটা বছর দেখতে দেখতে কেটে গেল। আজ আকাশ বিদেশ থেকে ডাক্তারি পাস্ করে দেশে ফিরছেন। তাকে আনতে তার বাবা-মা গাড়ি নিয়ে এয়ারপোর্টে গেছেন। দুপুর বারোটা পনেরোর আমেরিকা থেকে আসার ফ্লাইটটা ল্যান্ড করছে। আকাশকে দেখার জন্য তার বাবা-মা ব্যাকুল হয়ে চেয়ে আছেন। আকাশ প্লেন থেকে নেমে দেখে, তার মা তাকে দেখে এগিয়ে আসছেন। আকাশকে কাছে পেয়ে তার মা কেঁদে ফেলল। এ যে এক আনন্দের কান্না। আকাশকে অনেক বছর পর দেখল এবং আজ ছেলে বিলেত-ফেরত একজন ডাক্তার। আকাশ বিদেশ থেকে পাস্ করা ডাক্তার হলেও তার ইচ্ছেমতো গরিব, অসহায় মানুষদের বিনামূল্যে চিকিৎসা করেন। তাকে অসহায় মানুষগুলো ডক্টর আকাশ নামেই ডাকেন। সেদিনের সেই বাবা-মা মারা যাওয়া রাস্তায় ভবঘুরের মতো ঘুরে বেড়োনো, লোকের বাড়িতে কাজ করে খাওয়া ছেলেটা আজ সবার প্রিয় ডক্টর আকাশ সান্যাল।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন