আমাদের গন্তব্যটা এক
টিনা আর আদিত্য দুইজন খুব ভালো বন্ধু। শুধু বন্ধু বললে ভুল হবে, তার থেকেও বেশি। ওদের বন্ধুত্বটা শুধু বন্ধুত্বে আটকে থাকেনি, একটা ভালোবাসার সম্পর্কে পরিণত হয়েছে। টিনা বি.এ সেকেন্ড ইয়ারের ইতিহাসের ছাত্রী, আর আদিত্য বি.এ থার্ড ইয়ারের ইংরেজীর ছাত্র। ওদের দুজনের সম্পর্কটা পুরো কলেজ জানে। ওরা কলেজের খুবই পরিচিত ছাত্রছাত্রী। কলেজের যা কিছু অনুষ্ঠান বা কিছু হলে ওদের ছাড়া হয়না। ওরা পুরো কলেজ মাতিয়ে রাখে। দেখতে দেখতে আদিত্যর গ্রাডুয়েশান শেষ হয়ে গেল। গ্রাডুয়েশান এর শেষে আদিত্য তার বাবার কোম্পানি জয়েন করল। আদিত্যর বাবা আর.কে ইন্ডাস্ট্রির মালিক। আদিত্য খুব বড়ো বাড়ির ছেলে। টিনা সাধারন পরিবারের মেয়ে। দেখতে দেখতে আরও পাঁচটি বছর কেটে গেল, ততদিনে আদিত্য ওই কোম্পানির সমস্ত ভার গ্রহণ করেছেন। সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল, এরমধ্যে বিপদ হল আদিত্যর বাবা তার বিজনেস পার্টনারের মেয়ের সঙ্গে আদিত্যর বিয়ে ঠিক করলো। কিন্তু আদিত্য কিছুতেই রাজি নয়, ওদের সাত বছরের ভালোবাসা ও কিছুতেই ভুলতে পারবেনা। আদিত্য বাবা-মা আদিত্যকে ব্ল্যাকমেল করা শুরু করলো। বাধ্য হয়ে বাবা-মায়ের মুঝ চেয়ে বাবার বন্ধুর মেয়েকে বিয়ে করলো। টিনা সবকিছু শুনে ভেঙে পড়েছে। দুই-তিন বার মৃত্যুরও চেষ্ঠা করেছে, কিন্তু প্রতিবারই বাবা-মায়ের সাহায্যে বেঁচে গেছে। দেখতে দেখতে বহু বছর হয়েছে। এরমধ্যে টিনার মা-বাবা মারা গেছে, টিনার বয়েস হয়েছে চুল পেকেছে, বয়েসের ছাপ পড়েছে। আদিত্যর বিয়ের পর পর থেকে নিজেকে ডিপ্রেসন থেকে বের করে এনেছে, কিন্তু টিনা যে একজনকে ভালোবেসেছে, টিনা কাউকে বিয়ে করেনি। তার বাবা-মা বেঁচে থাকার সময় অনেক বুঝিয়েছে, কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। সে যে মনে মনে একজনকে অনেক দিন আগে বিয়ে করেছে, সে হল তার আদি (আদিত্য)। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর টিনা একটি বৃদ্ধাশ্রমে বৃদ্ধ মানুষদের দেখাশোনার কাজ করেন। ওই বৃদ্ধাশ্রমেই টিনা থাকে। আর এদিকে আদিত্যর ও বয়েস হয়েছে। আজ সে দুই ছেলের বাবা। দুই ছেলের হাতে তার বাবার মতো সেও কোম্পানির ভার তুলে দিয়েছেন। তার দুই বৌমা, নাতি, নাতনি নিয়ে সংসার। আদিত্যবাবু খেয়াল করেছেন তিনি ওই সংসারের কাছে ভারী হয়ে উঠেছেন। ছেলে বৌমার তাকে দেখেনা, আর আদিত্যর বাবা-মা ও বহুবছর আগে মারা গেছেন। আর তার স্ত্রী হটাৎ ক্যানসারে, তিনিও অনেকদিন আগে মারা গেছেন। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর আদিত্যবাবু দুই ছেলেকে মানুষ করেছেন, কিন্তু তারা আজ দেখেনা। আদিত্যবাবু ঠিক করলেন তিনি এই সংসারের বোঝা হতে চান না, তাই কাউকে কিছু না বলে তিনি বৃদ্ধাশ্রমের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন। তিনি গিয়ে উঠলেন সেই বৃদ্ধাশ্রমে, যেই বৃদ্ধাশ্রমে টিনা দেখাশোনা করেন। কিন্তু দুজনের কেউ জানতো না। আদিত্যর জানার কথা না থাকলেও টিনার জানা উচিত ছিল কে আসছে, কারন কোনো বৃদ্ধ বা বৃদ্ধা আসার আগে নাম-ঠিকানা টিনার কাছে যায়। এখানে টিনা জানতে পারেনি কারণ টিনা বৃদ্ধাশ্রমের কাজে আজ সাতদিন হল বাইরে গেছে, আজ রাতেই ফিরবেন। আদিত্য এই বৃদ্ধাশ্রমে আসার পর আদিত্যর বাড়ির জন্য মন খারাপ করলে কিছু করার নেই, তিনি যে ওই সংসারের বোঝা। তাই তিনি এই বৃদ্ধাশ্রমে সবার সঙ্গে পরিচয় করে নিয়েছেন। সে বুঝেগেছে আজ থেকে এটাই তার বাড়ি, এটাই তার পরিবার। রাত এগারোটার সময় টিনা কাজ শেষ করে বৃদ্ধাশ্রমে ফিরলেন। এত রাত হয়েগেছে, তাই তিনি ফ্রেস হয়ে খাওয়া দাওয়া করে ঘুমিয়ে পড়লেন। পরের দিন সকালে টিনা বাগানের গাছগুলোতে জল দিয়ে ফিরছিলেন তার রুমে, সেই সময় হঠাৎ একজনের সঙ্গে তার ধাক্কা লাগলো। টিনা পরে গেল, লোকটি টিনাকে তুলতে গিয়ে দুজন দুজনকে দেখে অবাক হয়ে গেল। টিনা দেখলো তার সেই আদি। টিনার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল তুমি? আদিও টিনাকে প্রশ্ন করলো তুমি এখানে? টিনা তখন বললো, আমি এই বৃদ্ধাশ্রম দেখাশোনা করি। টিনা দেখলো তার সেই আদির চেহারায় অনেক পার্থক্য, রুগ্ন শরীর, চুলগুলো উস্কো-খুস্কো, পরনের পোশাকও রেমন ভালো নেই। আদি দেখলো তার সেই টিনার সাজপোশাক, চেহারায় অনেক পার্থক্য, টিনার বয়স হয়েছে, চুল পেকেছে, পরনে সাদা শাড়ি। টিনা আদিকে জিজ্ঞাসা করল সে এখানে কেন? আদি তার বিয়ে থেকে বৃদ্ধাশ্রমে আসার আগে পর্যন্ত সমস্ত ঘটনা বলতে শুরু করল। টিনা সবকিছু শুনে নিজেকে সামলে রাখতে পারলো না। চোখে তার জল গড়িয়ে এল। সে ভাবতে লাগল, আদি আমি জানতাম তুমি ভালো আছো, তাই নিজেকে সামলে নিয়েছিলেন। কিন্তু আমি জানতাম না তুমি এতো কষ্টে আছো। এই ভেবে টিনা আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। সে তার নিজের রুমে চলে গেল। সন্ধে বেলায় টিনা সবকাজ শেষের পর নিজের রুমে বসে চুল বাঁধছে, এমন সময় দরজার কাছে এসে কেউ বললো, আসবো? পেছন ঘুরে টিনা দেখলো তার আদি। টিনা বললো এসো। দুজন চা খেতে খেতে কথাবার্তা বললো, দুজনের সারা জীবনের কথা। আদি তখন জিজ্ঞাসা করলো, আচ্ছা তোমায় একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো? টিনা বললো, বলো। আদি তখন টিনাকে বললো, তুমি এখানে কেন, তোমার পরিবারে কে কে আছে, নাকি তোমার অবস্থা আমার মতো? তিন তখন বললো, আমার পরিবার এটাই। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর এখানে। আদি জিজ্ঞাসা করলো, ছেলে-মেয়ে, স্বামী? টিনা বললো ওরা কেউ নেই। আদি বললো, নেই মানে? টিনা তখন বলে উঠলো একটা সময় স্বপ্ন দেখেছিলাম কাউকে নিয়ে সংসার করবো, সে ছেড়ে যাওয়ার পর আর ওই সংসারটা করা হয়নি। আদি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, তারমানে তুমি বিয়ে করোনি? টিনা বললো বিয়ে আমি বহুবছর আগে মনে মনে একজনকে করেছি। এই শুনে আদির চোখে জল। আদি বলে উঠলো, তাই হয়তো শেষ জীবনে এক জায়গায় আমরা দুজন, ভগবান হয়তো এটাই চান। টিনা বলে উঠলো, কি জানি? দুজনের চোখে জল। আদি বলে উঠলো, আমাদের গন্তব্যটা এক।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন