প্রতিশোধের প্রেমে
রাতের বেলায় আমি ঘুমিয়ে আছি। হটাৎ আমার ঘুমটা ভেঙে গেল। ঘুম ভেঙে দেখলাম, আমি এক গভীর জঙ্গলে। নিজেকে এত রাতে গভীর জঙ্গলে দেখে আঁতকে উঠলাম। তারপর মনে করলাম, কাল রাতে তো আমি ঘরেই ঘুমিয়ে ছিলাম। এখন আমি এখানে কেন? মনে করতে করতে উঠে দাঁড়ালাম। মনেহচ্ছে আশেপাশে কেউ আছে। আমি এগোতে যাব, মনে হল আমাকে কেউ আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রেখেছে। কিন্তু কাউকেই দেখতে পাচ্ছিনা। তারপর আমার আর কিছু মনে নেই। যখন জ্ঞান ফিরল, দেখলাম আমি বাড়িতে। সামনে মা, বাবা, বোন। মা বসে কাঁদছে। আমার জ্ঞান ফিরেছে দেখে বাবা-মা একটু স্বস্তি পেলেন। বাবা আমায় জিজ্ঞাসা করল, তুই দরজার বাইরে এভাবে পড়ে আছিস কেন? তখন বাবার কথাটা শুনে কাল রাতের কথাটা মনে পড়ল। কিন্তু বাবা-মা কষ্ট পাবে, চিন্তা করবে বলে বললাম, কাল রাতে ঘুম আসছিল না বলে একটু ঘুরতে বেরিয়েছিলাম। বাড়িতে ফেরার সময় মাথাটা একটু ঘুরিয়ে গেছিল, তারপর আর মনে নেই। এই শুনে বাবা-মা আর কথা না বাড়িয়ে আমায় বলল রুমে গিয়ে রেস্ট করতে। আমি রুমে গিয়ে ফ্রেস হয়ে বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাল রাতের কথা চিন্তা করলাম। হটাৎ মনে হলো আমার আশেপাশে কেউ আছে, কিন্তু কাউকে দেখতে পাচ্ছিনা। জল খাবো বলে টেবিলের উপর রাখা জলের গ্লাসটা নেব বলে হাত বাড়াচ্ছি, দেখছি জল গ্লাসটা আপনা-আপনি টেবিল থেকে সোফায় চলে গেল। আবার একটু এগিয়ে এসে মেঝের উপর গ্লাসটা পড়ে ভেঙে গেল। মনে হল আমায় কেউ আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রেখেছে। হটাৎ গ্লাস ভাঙার শব্দে মা ছুটে এল। বোনও এল পাশের রুম থেকে। ওরা আসতে দেখলাম, কেউ যেন ধরে রেখেছিল আমায় ছেড়ে দিল। মা জিজ্ঞেস করল, কিসের শব্দ? আমি বললাম, জল খেতে গিয়ে হাত থেকে গ্লাসটা পড়ে গেছে। মা-কে মিথ্যে বললাম, নাহলে চিন্তা করবে, তাই। এরকম বেশ কয়েকদিন চলতে লাগল। হটাৎ একদিন বোনের ফ্রেন্ড বোনের সঙ্গে আমার বাড়িতে এল। সবাই মিলে আড্ডা দিতাম। এই দুদিন দেখছি, বোনের বান্ধবী যখন আশেপাশে থাকে, তখন মনেহয় আমার আশেপাশে কেউ আছে, কিন্তু আমায় কেউ আঘাত বা স্পর্শ করতে পারছে না। এদিকে মা তার গুরুদেবকে ডেকে পাঠিয়েছেন। পরশু অমাবস্যা। গুরুদেব মা-কে বললেন, এই অমাবস্যাতেই আপনার ছেলের মহাবিপদ। সেই শুভশক্তিই পারে আপনার ছেলেকে বাঁচাতে। সেই শুভশক্তির সঙ্গে আপনার ছেলের মিলন হলেই ওরা দুজন পারবে অশুভ শক্তির বিন্যাস করতে। মা আর গুরুদেব কথা বলছিলেন, তখন বোন আর তার বান্ধবী দুজনে মাইল কলেজ যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে নিচে এল। হটাৎ বোনের বান্ধবীকে দেখে গুরুদেব দাঁড়িয়ে গেলেন। মা জিজ্ঞাসা করল, কি হল গুরুদেব? আপনি ওর দিকে এভাবে কি দেখছেন? গুরুদেব বলে উঠল, এই সেই মেয়ে যার জন্য এত বছর অপেক্ষা করছি আমরা। এই সেই শুভ শক্তি। গুরুদেবের কথা শুনে সবাই অবাক। গুরুদেবের বোনের বান্ধবীর ঘাড় না দেখে বললেন, ওর ঘাড়ের কাছে কোনো চিহ্ন আছে কিনা দেখতো? আমার মা ওর চুলগুলো সরিয়ে দেখলো, সত্যি সত্যি ওর ঘরের কাছে চক্রের মতো একটা চিহ্ন আছে। গুরুদেব বললেন, বলেছিলাম, এই সেই মেয়ে। বোনের বান্ধবী তখন বলে উঠল, এটা আমার জন্ম থেকে আছে। গুরুদেব বললেন, তা তো থাকবেই, তুমি যে শুভ শক্তি। তুমি আর এ (আমায় দেখিয়ে) মিলিত হলে তবেই অশুভ শক্তির বিনাশ হবে। তাই শুনে বোনের বান্ধবী লজ্জা পেলো, সঙ্গে ভয়ও। বোনের বান্ধবীর নাম দিশা। মা গুরুদেবের কাছে কথাটা শুনেই চললেন দিশার বাড়ি। ওর বাবা-মা র সঙ্গে সমস্ত কথা সেরে এলেন। কালই আমাদের বিয়ে দিতে চায় মা। পরশু অমাবস্যা, তাই এতো তাড়াতাড়ি। রাতে আজ ঘুম আসছেনা। মনেহচ্ছে আমার রুমে কেউ আছে। কিছুতেই ঘুম আসছেনা। এইভাবে এপাশ ওপাশ হতে হতে রাত কাটলো। আজ আমার বিয়ে। সেরকম কোনো অনুষ্ঠান হচ্ছেনা। শুধুমাত্র মেয়ের বাড়ির মন্দিরে মালাবদল, সিঁদুর দান হচ্ছে। এই করে আমাদের বিয়েটা সম্পন্ন হল। তারপর বিদায়ের পালা। বিদায়ের সব নিয়মকানুন শেষ করে দিশাকে নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। আজ আমরা আলাদা থাকছি, কারণ আজ কালরাত্রি। রাতে শুতে গেলাম নিজের রুমে ফ্রেস হয়ে। কিন্তু ঘুম আসছেনা। বারান্দায় গিয়ে দোলনাটার কাছে বসছি। ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছে।মনেহল, কেউ আমার পাশে বলে উঠল, আমায় ধ্বংস করার জন্য ওকে বিয়ে করেছিস। কিন্তু আমি তোকে ছাড়ব না। হটাৎ এই কথা শুনে চমকে উঠলাম। পেছন ঘুরে দেখলাম, কেউ একজন ছায়ার মতো চলে যাচ্ছে। কিন্তু কে? তারপর আর তাকে দেখতে পেলাম না। ভাবলাম কে আমার সঙ্গে এমন করছে? কেনই বা করছে? ভাবতে ভাবতে নিজের রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম ভেঙে দেখি পূব-আকাশের রোদটা জানালা দিয়ে আমার মুখে পড়েছে। তারপর মা এসে ডাকাডাকি করছে, বাবু উঠে পড়। উঠে স্নান সেরে নিচে যেতে বলল, ঠাকুর মশাই চলে এসেছেন। আজ বাড়িতে পুজো হবে, যজ্ঞ হবে। আমি কথা-মত রেডি হয়ে নিচে গেলাম। গিয়ে দেখি দীপা স্নান সেরে ঠাকুর মশাইয়ের হাতে হাতে কাজ করছে। আমি গিয়ে কাছে বসলাম। কিছুক্ষনের মধ্যে পুজো শুরু হল। হটাৎ যজ্ঞের আগুনটা নিভে গেল। আমি হটাৎ গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেলাম। কোথায় যাচ্ছি জানিনা। আমার মধ্যে আজ অদ্ভুত চেঞ্জ লাগছে। চোখ লাল হয়ে যাচ্ছে, চুল উস্কো-খুস্কো। আমি বাড়ি থেকে যখন বেরিয়ে আসছিলাম, তখন সবাই আমায় ডেকেছিল, কিন্তু আমি কিছু শুনিনি। শুধু আমার মনে হয়েছিল, কেউ আমায় ডাকছে, সেখানে যেতে হবে। সেই সময় শুধু গুরুদেব বলেছিলেন, ওকে ডেকে লাভ নেই, ও নিজের মধ্যে নেই। আজ অমাবস্যা, সে এসে গেছে। সেই মহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত। ওকে শুধু দীপা মা ছাড়া কেউ বাঁচাতে পারবেনা। তখন বাড়ির সবাই বলে উঠল, কিন্তু ও গেল কোথায়? গুরুদেব বললেন, আমি জানি ও কোথায় গেছে। ও সেই পুরোনো পোড়া রাজবাড়িতে গেছে। আমি গিয়ে একটা পুরোনো পোড়া রাজবাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড় করালাম। আমি একপা একপা করে রাজবাড়ির ভেতরে ঢুকছি। কেউ বলে উঠল, এসো, আমি তোমার জন্যই অপেক্ষা করছি। আমি ভেতরে গিয়ে দেখি, রাজবাড়ির সমস্ত আসবাবপত্র, সবকিছু পোড়া, নোংরা অবস্থায় পড়ে। চারিদিকে মাকড়সার ফাঁদ। আমি ঢোকার কিছুক্ষন পরেই দেখলাম, দিশা ঢুকছে। বাইরে বাড়ির সবাই। কিন্তু খেয়াল করলাম, দিশা এই রাজবাড়িতে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে দিশা পাল্টে গেল। পরনে সাদা রঙের রাজবেশ, দেখে মনেহচ্ছে কোনো রাজার রানী তিনি। হাতে তলোয়ার, ঢুকতে ঢুকতে হুঙ্কার করছেন, বেরিয়ে আয় পূর্বাশা, আজ তোর সঙ্গে আমার যুদ্ধ হবে। পুরো রাজবাড়ি দিশার পা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন করে জেগে উঠল। দিশা চিৎকার করে বলছেন, দেখ, রানী রুক্মিণী তোর সামনে দাঁড়িয়ে আজ। তিরিশ বছর আগে যে রাজা প্রতাপ সিংহ আর রানী রুক্মিনীকে তুই পাহাড়ের ওপর থেকে ঠেলে মেরে ফেলেছিলিস, আজ সেই রানী তোর সামনে দাঁড়িয়ে। আমি ফিরে এসেছি আমাদের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে। দিশার এইসব কথা শুনে আমি দিশার দিকে হা করে তাকিয়ে আছি। দিশার এই রূপ দেখে ভেতর থেকে একজন বেরিয়ে এলেন। তাকে দেখে দিশা বললেন, দেখ, তোর সামনে রানী রুক্মিণী। আজ আমি তোকে ধ্বংস করতে এসেছি। এই কথা শুনে পূর্বাশা ভয় পায়। বলে, তুই? তোকে তো আমি মেরে ফেরেছিলাম। দিশা বলল, হ্যাঁ, দেখ তোর সামনে রাজা প্রতাপ সিংহ আর রানী রুক্মিণী দাঁরিয়ে, প্রতিশোধ নিতে ফিরে এসেছি। দিশার কথা শুনে আমি মাথা-মুন্ডু কিছুই খুঁজে পাচ্ছি না। আমায় দেখিয়ে রাজা প্রতাপ সিংহ বলছে কেন দিশা? এমন সময় দেখি পূর্বাশা আমার দিকে তেড়ে আসছেন মারার জন্য, আর দিশা তাকে আটকাচ্ছে। কিন্তু আন্তাশক্তির কাছে দিশা পেরে উঠছেনা। হটাৎ শুনলাম, রাজবাড়ির ভেতর থেকে দৈববাণী হচ্ছে, রানীমা, ওই তলোয়ারে তোমার রক্ত লাগিয়ে ওকে বধ করো। সঙ্গে সঙ্গে দিশা ওই তলোয়ার দিয়ে নিজের হাত কেটে ওই তলোয়ারে লাগলো, আর ওই তলোয়ার দিয়ে পূর্বাশাকে শেষ করল। তাপর দিশা আমার হাত ধরে বাইরে নিয়ে গেল। বাইরে গিয়ে দেখলাম, সবাই বাইরে দাঁড়িয়ে। দিশা আবার দিশার রূপে ফিরে এসেছে। পেছন ঘুরে দেখলাম, সেই রাজবাড়ি আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেছে, সেই পোড়া রাজবাড়ি। তারপর সবাই বাড়ি এলাম। বাড়ি ফিরে এসে দিশাকে জিজ্ঞাসা করলাম, রানী রুক্মিণী কে? দিশা বলল জানিনা, আমি তখন যা যা বলেছি তা কিছুই জানিনা। যা করেছি, কেন করেছি, তাও জানিনা। পূর্বাশা কে? রানী রুক্মিণী কে? রাজা প্রতাপ সিংহ কে? কিছুই জানিনা। তখন গুরুদেব আমাদের সব বললেন। রানী রুক্মিণী আর রাজা প্রতাপ সিংহ ছিলেন জয়পুরের রাজা-রানী। আর পূর্বাশা ছিল রানীর সখি। একদিন রাজা-রানী এক পাহাড়ে বেড়াতে গেলেন, সঙ্গে পূর্বাশাও ছিল। রাজা-রানী পাহাড়ের ওপর উঠতেই পূর্বাশা ওদের দুজনকে পাহাড় থেকে ঠেলে ফেলে দেয়। কারন পূর্বাশার লোভ ছিল রাজত্বের ওপর। তাই সে ঠিক করে, রাজা ও রানীকে সে শেষ করে পুরো রাজত্বের রানী সে হবে। তাই সে তার ভাবনা মতো রাজা-রানীকে পাহাড় থেকে ঠেলে ফেলে দেয়। পাহাড় থেকে পড়ে যাওয়ার সময় রানী রুক্মিণী বলেছিলেন, আমি ফিরে আসবো, তোকে শেষ করতে। ঠিক সেই মতো রাজা প্রতাপ সিংহ ও রানী রুক্মিণী, আদি ও দিশা হয়ে তোমরা ফিরে এসেছো। আর পূর্বাশার মৃত্যুর পর ওই রাজবাড়িতে তার আত্মা হয়ে থেকে গেছে। গুরুদেবের কথা শুনে আমরা দুজন অবাক। আর আমিও আমার সুস্থ অবস্থায় ফিরে এসেছি। আজ রাতে আমাদের রিসেপশন। নতুন জীবনের জন্য আমাদেরকে আশীর্বাদ করবেন।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন