জন্মদিনের উপহার

আজ আমার চল্লিশতম জন্মদিন। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হল, দারোয়ান এসে আমায়  একটা ফুলের তোড়া দিয়ে বলল ম্যাডাম, এটা এখন আপনার জন্য দিয়ে গেছে। আমি দারোয়ানকে জিজ্ঞাসা করলাম, কে দিলো  এটা? দারোয়ান বলল, তাকে আমি চিনিনা। আমি ভাবলাম হয়তো ভুল করে এসেছে, পরক্ষণে ফুলের তোড়াটা দেখতে লাগলাম। পুরো তোড়াটা লাল গোলাপ দিয়ে তৈরি। তাতে একটা কাগজে লেখা, শুভ জন্মদিন, তোমার জীবনটা সুন্দর হয়ে উঠুক। তাতে আমার নামও লেখা। আমার নামটা দেখে বুঝলাম কেউ ভুল করে পাঠায়নি, জেনে-শুনেই পাঠিয়েছে। এখানে কেউ তো জানেনা আজ আমার জন্মদিন, তাহলে? এখানে দুবছর হল ট্রান্সফার নিয়ে এসেছি। এই দুই বছরই জন্মদিনে কেউ উপহার হিসেবে ফুলের তোড়া  পাঠায়। এর আগেতো কেউ এমন করেনি। এই দুবছর এখানে এসেছি। এই দুবছর দেখছি এমন হচ্ছে। কিন্তু কে এমন করছে? যে উপহার দিচ্ছে সে সামনেই বা আসছে না কেন? এইসব ভাবতে ভাবতে সারারাত ঘুম হলনা। পরেরদিন স্কুলে গিয়ে স্টাফদের সামনে বসে সবাইকে খেয়াল করেছি। কিন্তু কাউকে তো তেমন মনে হচ্ছে না। সবাই আমার সাথে হাসি-ঠাট্টা করছে, কথা বলছে, কিন্তু কেউ তো আমার জন্মদিনের কথা, কিছু বলছে না। দেখেও মনে হচ্ছেনা কেউ জানে বলে। হটাৎ পিয়াসা আমায় ডেকে বলল, আপনাকে হেড ম্যাম ডাকছে। আমি অবাক হলাম। আমায় কেন ম্যাম ডাকছেন? ভাবতে ভাবতে ম্যামের দরজার সামনে গিয়ে বললাম, ম্যাম আসবো? ম্যাম বলল, এসো। ভেতরে যেতেই দেখলাম একজন বসে আছেন। আমাদের স্কুলের সেক্রেটারি মহাশয়। ম্যাম আমায় বললেন, বসো, তোমার সঙ্গে কিছু কথা আছে। এই শুনে আমি ঘাবড়ে গিয়ে বললাম, হ্যাঁ ম্যাম, বলুন। তারপর ম্যাম যা বললেন তা শুনে আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম। ম্যাম বললেন, তোমায় ভাবার জন্য এক সপ্তাহ টাইম দিলাম। সেদিন স্কুল থেকে ফিরে স্থির হতে পারিনি। রাতে ঘুমও আসছে না। জোৎস্না রাতে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। আর নিজের অতীতটা ভাবতে লাগলাম। তখন আমি ক্লাস ১১-তে পড়ি, বাবা মারা যায়। মা একা, সাথে দুই ভাই-বোন। তখন দুই ভাই-বোনকে মানুষ করার দায়িত্ব নিই আমি। বাড়ির পশে একটা স্কুলে পড়ানো শুরু করি। যা টাকা পেতাম, তা দিয়ে সংসার চালাতাম। ভাই-বোনকে পড়ানো, ওদের দেখাশোনা করতাম। কিন্তু টানাটুনি পড়ে যেত। শেষে কিছু টিউসনও করতাম। তাই দিয়ে চলল মোটামুটি। ভাই-বোন বড় হল। ওদের বিয়ে দিলাম। কিন্তু ওদের কথা ভাবতে গিয়ে নিজের কথা ভাবা হয়নি। একটা সময় পর মা মারা গেল। তারপর নিজের মনে হতে লাগল, ভাই আর ভাই-বউয়ের সংসারে আমি বোঝা। তাই আজ দুবছর হল আমি এখানে চলে এসেছি। কিন্তু এই বয়সে এসে নিজের জন্য কিছু ভাবাটা সমাজের চোখে খিল্লি ছাড়া আর কিছুই না। এইসব ভাবতে ভাবতে সারা রাট কাটল। সপ্তাহের প্রতিটা দিন স্কুলে যাই আর আসি।  বাড়িতে এসে চিন্তা-ভাবনা করি। দেখতে দেখতে আজ এক সপ্তাহ পূর্ণ। কিন্তু আমার ভাবনার কোনো সদুত্তর নিজেই পেলাম না।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

নতুন জীবন

ভালোবাসার এপিঠ ওপিঠ