সময় থাকতে দাম দিন
একদিন অফিসে যাবো রিক্সার জন্য অপেক্ষা করছি। এমন সময় এক বৃদ্ধ রিক্সা নিয়ে আসছেন। আমি হাত দেখালাম রিক্সা থামানোর জন্য। রিক্সা থামলো, আমি ওই রিক্সায় উঠলাম। কিছুটা যাওয়ার পর ওই চাচাকে জিজ্ঞাসা করলাম, চাচা আপনি এই বয়সে রিক্সা চালান কেন? আপনার কি ছেলে মেয়ে নেই? চাচা বললো, মেয়ে নেই, আমার একটি ছেলে আছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম দেখেনা আপনাকে? চাচা বললো দেখে, তেমন নয়। আমি দিতে পারলে দেখে। নাহলে তেমন দেখেনা। আমি চাচাকে জিজ্ঞাসা করলাম, খুব কষ্ট হয়না চাচা? চাচা আমাকে বললো, এর থেকে বেশি কষ্ট হয়, আমি অতীতে যা ভুল করেছি তার জন্য। কথাটা শুনে আমি চাচাকে বললাম, মানে? অতীতে কি এমন করেছেন আপনি,যার জন্য এতো কষ্ট পাচ্ছেন? চাচা তখন বললো, আমি আমার বাবা মার পছন্দে বিয়ে করেছিলাম। মেয়েটা এতটাও সুন্দরী ছিলোনা। তাই আমি প্রথম থেকে ওকে পছন্দ করতামনা। ওকে খুব কষ্ট দিতাম, মারতাম, খেতে দিতামনা ঠিকমতো, অনেক অত্যাচার করতাম ওর ওপর। বিয়ের দুবছরের মাথায় বাবা মা মারা যায়। ব্যস, তখন স্ত্রী এর ওপর আরও অত্যাচার শুরু করলাম। কিন্তু সে মুখ বুঝে সব সহ্য করতো, কোনো দিন কিছু বলেনি। তার পর আমার ছেলে হলো। কথায় কথায় ওর ওপর হাত তুলতাম, ছেলেকে কিছু বললে আমি ঘুরে ওকে মারতাম। ছেলে একটু বদমাসি করলে ও বকতো, ছেলেকে ও বকছে বলে ভালো মন্দ না দেখে আমি ওকে মারতাম। মানে আমি সুযোগ খুজতাম, কোনো না কোনো উপায়ে ওর ওপর অত্যাচার করার। ছেলে যখন যা চাইতো তখন তাই এনে দিতাম। যা বলতো তাই শুনতাম। ওর মা বলতো এতো পশ্রয় দিওনা। আজ থেকে সব পেয়ে গেলে, পর পর ওর চাহিদা বাড়তে থাকবে। আমি সে সব বুঝতামনা। ঘুরে ওর ওপর অত্যাচার করতাম। একদিন ও আমার কাছে একটা জিনিস চেয়েছিলো, ওর মা আমাকে বাধা দেওয়াতে ও ওর মা কে বলেছিলো, তুমি এতো খারাপ কেনো বলতো মা? তুমি সবকিছুতে না না বলো। বাবা কত ভালো যা বলি সব শোনে। সেদিনও আমার স্ত্রী এর কথাটা খারাপ লেগেছিলো, দিয়ে ওকে উল্টো পাল্টা বলে ফেলি। এ দিকে তখন ছেলেও অনেক বড়ো হয়েছে, কলেজে পড়ে। সে দিন রাতে শুতে গিয়ে আমার স্ত্রী আমায় বললো, ছেলেকে এতটাও পশ্রয় দিওনা যে একদিন তোমায় না দেখে। সেদিন আর আমি আমার স্ত্রী কে কিছু বললামনা। ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম ভাঙ্গলো সকালে। ঘুম থেকে উঠে একটা জিনিস দেখে মনের ভেতরটা কেমন করে উঠলো। উঠে দেখি আমার স্ত্রী আমার কাছে এক সাইড হয়ে শুয়ে আছে। মনের ভেতর কু ডাকছে, ও তো এতো সকাল অবদি শুয়ে থাকেনা? আজ কেন শুয়ে আছে? ওকে ডাকলাম, কোনো সাড়া পেলামনা, হাতদিয়ে ওকে ঠেলতে গিয়ে দেখি আমার স্ত্রী এর পুরো শরীর ঠান্ডা। ও আর বেঁচে নেই। আমার চারপাশটা অন্ধকার হয়ে গেলো, চারিদিক শুন্য লাগছে। নিজেকে ঠিক রাখতে পারছিনা। অথচ বেঁচে থাকতে কতো অত্যাচার করেছি। আজ আমার সংসার শুন্য। কিছুক্ষন পর আমি নিজে গিয়ে ওকে কাফন করে এলাম। দেখতে দেখতে কিছু বছর কাটলো। ছেলে বিয়ে করেছে। একদিন ছেলে বললো বাবা তোমার যা আছে তা আমার নামে করে দাও। আর না দিলে আমি থাকতে দেবোনা আর খেতেও দেবোনা। আমি সব ছেলেকে দিয়ে দিয়েছি। তারপর ও ছেলে দেখেনা সে রকম। আজ বুঝতে পারি ওর মা ঠিক ছিল। আজ তার কথা শুনলে ছেলেটা এমন হতোনা। আজ আমার স্ত্রীর জন্য খুব কষ্ট হয়। আমি ওকে কত মেরেছি, খেতে দেইনি। আমি যদি ওর যত্ন করতাম আজ এতো তাড়াতাড়ি ও চলে যেতোনা। আর আমার অবস্থা এমন হতোনা। আর একটা কথা বলি বাবা তোমায়, আমি যা ভুল করেছি কোনোদিন তা ভুল করোনা। স্ত্রী কে কষ্ট দিওনা। কারন একমাত্র তোমার স্ত্রী নিঃস্বার্থ ভাবে তোমার মৃত্যু পর্যন্ত পাশে থাকবে। আর কেউ থাকবেনা। ছেলে মেয়ে, মা বাবা কেউ থাকবেনা। তুমি তাকে যত কষ্ট দাও তারপরও সে তোমায় ভালোবাসবে। বার্ধক্যটা একটা মানুষের কাছে খুব কষ্টের। আর সেই সময় যদি সেই কাছের মানুষটা থাকে এতটাও কষ্টের হয়না। আর সেই বার্ধক্য পর্যন্ত এক মাত্র একজন পাশে থাকতে পারে সে হলো আপনার স্ত্রী। আর কেউ নয়। তাই সময় থাকতে স্ত্রীকে মর্যাদা দিন। তাকে মারধর নয়, ভালোবাসা দিন। কারণ ওই আপনার শেষ জীবনের সঙ্গী। চাচার কথা গুলো শুনে আজ সকালে আমার স্ত্রী এর সঙ্গে ঝগড়ার কথা মনে পড়লো। মনে মনে বললাম অফিস থেকে ফিরে সব মিটিয়ে নেবো। চাচাকে বললাম, চাচা আজ আপনি অনেক দামি কথা বললেন। আজ একটা শিক্ষা পেলাম।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন