প্রতিশোধ

সবেমাত্র বিয়ে করে এবাড়িতে এসেছি আজ একদিন হলো। আজ বিকেলে আমার ননদ বাড়ি চলে যাচ্ছে। ওর ছেলের স্কুল আছে, তাই থাকবেনা। আমার ননদ তৈরী হয়ে গেছে। এবার সে ব্যাগপত্র নিয়ে বেরোবে। যাওয়ার জন্য গাড়িও এসেগেছে। তাই আমার শাশুড়ির সঙ্গে কথা বলছে। আমি আমার শাশুড়ির রুমে ঢুকতে যাবো, সেই সময় শুনলাম আমার ননদ আমার শাশুড়িকে বলছে মা তোমার বৌমা এসেগেছে, এবার তোমার মনের যত ক্ষোভ, রাগ, সখ আছে তা মিটিয়ে নাও। তা শুনে আমার শাশুড়ি বললো তা আর বলতে। এই কথা শুনে আমি আর শাশুড়ির রুমে না ঢুকে দৌড়ে নিজের রুমে চলে এলাম। দিয়ে মনমরা হয়ে বসেআছি আর ভাবছি আমি কোথায় এসে পড়লাম। এমন সময় আমার ননদ এসে বললো, নীলা আমি আসছি, সাবধানে থেকো, সুখে সংসার করো। ননদের এই কথা শুনে মনে মনে ভাবলাম, মানুষের কত রূপ হয়। কিছুতেই সেই কথাটা ভুলতে পারছিনা। ননদ চলে যাওয়ার পর আমার শাশুড়ি আমার রুমে এসে একটা শাড়ি হাতে দিয়ে বললো বৌমা, এই শাড়িটা তোমার মায়ের জন্য। কাল তোমরা অষ্টমঙ্গলায় যাওয়ার সময় নিয়ে যেও। শাশুড়ির এই কথা শুনে মনে মনে ভাবলাম, সবকিছুই লোক দেখানো। মনে এক আর মুখে এক। তারপর থেকে শাশুড়ি ভালো কথা বললেও, মনটা সায় দিতোনা। খালি ওই কথাটা মনে পড়তো। বিয়ের পর আমার প্রথম জন্মদিন। এই জন্মদিনে আমার শাশুড়ি নিজে হাতে সব আয়োজন করেছে আমার জন্য। আজ সমস্ত আত্মীয় এসেছে বাড়িতে, কেক কাটা হবে, মা নিজের হাতে পায়েস বানিয়েছেন। সবকিছু দেখে আমি অবাক হলাম। আবার সেদিনের কথাটা মাথায় এলো। কথাটা মাথায় আসতে ভাবলাম, আমার কি কোথাও ভুল হচ্ছে মানুষটাকে বুঝতে। এই সব সাত পাঁচ ভেবে ভেবে আমি ওপর থেকে নামছি, হটাৎ শুনলাম আমার বড়ো মাসিশাশুড়ি আমার শাশুড়িকে বলছে, বাড়ির বৌয়ের আবার জন্মদিন পালনের কি আছে। যতসব ঢং তোর। বিয়ের সময় বলেছিলাম বাড়ির বৌকে মাথায় তুলবিনা, একটু শাসনে রাখবি। দেখ আমাকে, আমি আমার বৌমাকে কেমন শাসনে রেখেছি। একটুও এদিক ওদিক হতে দিই না। আর তুইতো দেখছি তোর বৌমাকে আস্পর্ধা দিয়ে দিয়ে মাথায় তুলছিস। যখন বৌমা তোর ওপর ছড়ি ঘোরাবে তখন বুঝবি। সেদিন তোর মনে হবে দিদি ঠিকই বলেছিলো। মাসিশাশুড়ির কথা শুনে আমার শাশুড়ি মুখে হাসি নিয়ে বললো,আমার ওপর যদি সে ছড়ি ঘোড়ায়, ঘোরাবে। এটাতো তারই সংসার। আমি আর কতদিন। আর বাকি রইলো জন্মদিন, আমি আমার বৌমাকে মেয়ের মতো ভালোবাসি। মেয়েরা যখন বাপের বাড়িতে থাকে তখন তাদের বাবা মা জন্মদিন পালন করে। শশুর বাড়িতে কেন হবেনা? আমি আমার ছেলে মেয়ের জন্মদিন পালন করছি, বৌমার বেলায় না কেন? আর দিদি আমি তোমার কথা শুনে যদি তোমার মতো বৌমার সঙ্গে ব্যবহার করতাম তাহলে, আমি আমার বৌমার থেকেও সেই রকম ব্যবহার পেতাম। যেটা তুমি তোমার বৌমার কাছ থেকে পাও। তাই বলছি বৌমাকে মেয়ের মতো ভালোবাসো, তুমিও মায়ের মতো ভালোবাসা পাবে। বৌমা হাতের মুঠোয় বা পায়ের তলায় রাখার মানুষ নয়। তাদেরও ইচ্ছে করে তাদের জন্মদিন গুলো কেউ পালন করুক। আমার শাশুড়ির এই কথা শুনে আমার মাসিশাশুড়ি মুখটাকে চুন করে, মুখ বেঁকিয়ে চলে গেলো। আমি মানুষটাকে দেখছি আর ভাবছি, এমন মানুষও হয়। তারপর বেশ ধুমধাম ভাবে জন্মদিন হলো। মা আমার জন্য নিজের হাতে পায়েস বানিয়ে আমায় খাওয়ালেন। আমি শুধু মানুষটাকে দেখছি আর ভাবছি আমার এই মানুষটাকে বুঝতে কোথাও ভুল হয়েছে। তার পর থেকে সেই আবার অফিস। আমি আর হাসবেন্ড সকালে অফিস চলে যাই। মা সারাদিন বাড়ির কাজ করে। আমি আর আমার হাজবেন্ড যে অফিস যাই, আমাদের টিফিন-লাঞ্চ-জল সব মা ভরে দেন। আমি মাকে বলি আমি রান্না করি, মা বলেন ছুটির দিন থাকলে তু্ই করবি। তুই তো সারাদিন অফিস করিস, অফিসের অনেক চাপ থাকে বুঝি সব। তার পর এই রান্না বান্না, সংসারের কাজ? ছাড় এসব,আমি যতদিন পারছি করে নিচ্ছি। আর আমি না থাকলে তোকেইতো সারা জীবন করতে হবে। একদিন আমি আমার হাজবেন্ড আর আমার শাশুড়িমা খেতে বসেছি। বিভিন্ন রকম কথা বার্তা হচ্ছে। আমার শাশুড়ি বলছে মারে কোনোদিন চাকরিটা ছেড়েদিসনা। ভগবানের দয়ায় আমাদের কম কিছু নেই। তাও বলবো চাকরিটা ছাড়িসনা। টাকার জন্য নয়, নিজের একটা আইডেনটিটি এর জন্য। আজকের দিনে মেয়েদের আইডেনটিটি এর ভীষণ দরকার। একদিন আমিও চেয়েছিলাম চাকরি করবো। তা আর হয়নি। এই কথা বলতে গিয়ে দেখলাম মায়ের চোখে জল। মাকে বললাম কেন চাকরি করেননি আপনি? মা বললো সে অনেক কথা, বাদ দে সেই সব কথা। আমি মাকে বললাম বলুননা। মা তখন চোখ মুছে বলতে শুরু করলো। মা বললো -আমি এই বাড়িতে বিয়ে করে আসার কিছুদিন পর আমি আমার হাজবেন্ডকে বলি, আমি চাকরি করতে চাই। তোমার বাবারও কোনো আপত্তি ছিলোনা। তার কিছু দিন পর সে বাড়িতে জানায় যে আমি চাকরি করতে চাই। সেই কথা শুনে আমার শশুর শাশুড়ি বলে দেয় যে এটা বনেদি বাড়ি। এই বাড়ির কোনো বউরা চাকরি করেনা। এটা আমাদের ঐতিহ্য যে বাড়ির বউরা চাকরি করবেনা। আর তোমার চাকরি করতে হলে এই বাড়ি ছেড়ে তোমায় চলে যেতে হবে। এই কথা শুনে সেদিন আর আমি কিছু বলিনি। নিজে নিজে কষ্ট পেতাম। সেটা তোমার বাবা বুঝতো, যে আমি কষ্ট পাচ্ছি এটা নিয়ে। তার পর বাড়ির সঙ্গে অনেক তর্ক বিতর্ক হয়েছে তোমার বাবার। আমায় চাকরি করানো নিয়ে। আমি যখন দেখলাম আমার জন্য ঝামেলা হচ্ছে, আমি শেষমেষ তোমার বাবাকে বললাম, বাদদাও। আর ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ নেই। আমি চাকরি করবোনা। তারপর বাবু হলো। বাবুকে নিয়ে আর সংসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। একদিন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমার বৌমা হলে আমি তাকে চাকরি করাবো। বাড়ির বউরা যদি চাকরি না করা এই বাড়ির ঐতিহ্য হয়। আমি সেই ঐতিহ্য ভাঙবো। আমার সিদ্ধান্ত মতো আমি চললাম। আমি চাই তুমি কোনোদিন চাকরিটা ছেড়োনা। বিয়ের পরের দিন তোমার ননদ বাড়ি যাওয়ার সময় বলে গেলো, মা তোমার বৌমা এসেগেছে। এবার তোমার যত সখ আল্লাদ আছে মিটিয়ে নাও। আমি বললাম সে আর বলতে। দেখ আমি আমার সমস্ত সখ আল্লাদ তোর মাধ্যমে মিটিয়ে ফেললাম। মানুষটার কথা শুনে নিজেকে বললাম ছিঃ। এতো নিচু মন আমার। আমি সেদিন ওই কথা গুলো শুনে মানুষটাকে ভুল ভেবেছিলাম। আর এই মানুষটার এতো বড়ো মন। মায়ের কথা শুনে নিজেই কান্না করে দিলাম। তার পর মা কে জড়িয়ে ধরে বললাম তোমার মতো শাশুড়িমা প্রতি ঘরে ঘরে জন্মালে আজ এমন হতোনা মা। আমার নিজের মাও হয়তো এতটা ভাবেনি আমার জন্য। আমার চোখের জল মুছিয়ে মা বললেন ধুর পাগলী মেয়ে আমার। এসব বলেনা। নে এবার তোরা খাওয়া শেষ কর। আমাকেও তো খেতে দিবি নাকি। নাকি শুধুই গল্প করবি। এই বলে হেসে দিলেন। মানুষটাকে দেখছি আর ভাবছি, এতবড়ো মনের মানুষও হয়।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

নতুন জীবন

ভালোবাসার এপিঠ ওপিঠ