অবিশ্বাস্য

কুকুরটির জীবনযাপন ছিল তুর্কিতে। তুরস্কের অন্যান্য কুকুরদের মতো অনারঙ্গপূর্ণ। তুরস্কের রাস্তায় মানুষের ফেলে দেওয়া খাবার খেয়ে তার দিন কাটতো। কিন্তু হটাৎ একদিন কুকুরটির সাথে ঘটে যায় এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা। যদিও কুকুরটির দিন শুরু হয়েছিল অন্যানো সাধারণ দিনগুলোর মতোই। কিন্তু হটাৎ করে সে একটি ড্রেন এর পাশে চলে আসে। সে একটি গন্ধ পায় এবং সে গন্ধ শুকতে থাকে। তারপর কুকুরটি শুরু করে দেয় অস্বাভাবিক সব ক্রিয়াকলাপ। কুকুরটি সবসময় রাস্তার ধরে একটি কসাইয়ের দোকানের সামনে গিয়ে বসে থাকতো। বসে কসাইয়ের দোকানে আসা ক্রেতাদের মাংস কেনা পর্যবেক্ষণ করতো। হটাৎ একদিন অ্যানি নামে এক যুবতী মেয়ে সেই কসাইয়ের দোকানে মাংস কিনতে আসে। মাংস কিনে বাড়ি ফেরার সময় সে বুঝতে পারে তার পেছনে কুকুরের শব্দ। মেয়েটি মনে করে কুকুরটি হয়তো বেশ ক্ষুধার্থ। এবং মেয়েটির কুকুরটির ওপর খুব মায়া হয়। মেয়েটি তৎক্ষণাৎ সেই কসাই এর দোকানে গিয়ে কিছু হাড় কিনে নেয়। মেয়েটি সেগুলো কিনে বাইরে বেরিয়ে দেখে কুকুরটি দুর থেকে তাকে দেখছে। মেয়েটি কুকুরটির কাছে এগিয়ে যায়। এবং সে কুকুরটিকে সে গুলো দিয়ে দেয়। যদিও প্রথম দিকে কুকুরটি মেয়েটির কাছে যেতে চাইছিলোন। কারণ কুকুরটি মেয়েটিকে ঠিক ভরসা করে উঠতে পারছিলোনা। কিন্তু কিছুক্ষন চেষ্টা করে মেয়েটি কুকুরটির বিশ্বাস অর্জন করে নেয়। আর সেই বিশ্বাসের ওপর ভরসা করে কুকুরটি মেয়েটির কাছ থেকে সেই হাড়গুলি নিয়ে নেয়। কিন্তু ঠিক তখনই কুকুরটি সেই হাড় গুলো খাওয়ার পরিবর্তে, হাড় গুলোকে মুখে তুলে নিয়ে অন্য দিকে যাত্রা শুরু করে। মেয়েটি কুকুরটির এমন অস্বাভাবিক আচরণ দেখে খুব অবাক হয়ে যায়। কারণ কুকুরটি সেগুলো না খেয়ে সেগুলো কেন নিয়ে যাচ্ছে? এমন প্রশ্ন তার মনে ঘুরপাক খাচ্ছিলো। কিন্তু সেদিন তার হাতে খুব বেশি সময় ছিলোনা। তাই সে দ্রুত বাড়ির দিকে চলে যায়। পরেরদিন মেয়েটি রাস্তায় বের হয়ে কুকুরটিকে ঠিক আগের জায়গায় দেখতে পায়। কুকুরটি মেয়েটিকে দেখতে পেয়ে লেজ নাড়তে নাড়তে মেয়েটির কাছে চলে আসে। মেয়েটি কুকুরটির এমন আচরণ দেখে মুচকি হাসি দেয়। সে দিনও মেয়েটির হাতে বেশি সময় ছিলোনা। তাই দোকান থেকে কিছু সসেস কিনে কুকুরটিকে দিয়ে দেয়। আর সেদিনও কুকুরটি সেই খাবার গুলো না খেয়ে মুখে নিয়ে অন্যদিকে যাত্রা শুরু করে। মেয়েটি আবারো কুকুরটির এমন অস্বাভাবিক আচরণ দেখে খুব কৌতুহলী হয়ে ওঠে। কিন্তু সেদিও তার কাছে সময় না থাকায়,কুকুরটির পিছু না করে মেয়েটি তার কাজে চলে যায়। তৃতীয় দিনও মেয়েটি কুকুরটিকে আগের অবস্থায় দেখতে পায়। মেয়েটি বুঝতে পারে কুকুরটি তার জন্য অপেক্ষা করছে। তাই মেয়েটি বাসা থেকে বেরোনোর সময় কুকুরটির জন্য কিছু খাবার নিয়ে আসে। সেদিনও কুকুরটি আগের মতো খাবারগুলো না খেয়ে অন্য দিকে নিয়ে যাত্রা শুরু করে। তবে আজ অ্যানি নিজের কাজে না গিয়ে কুকুরটির পেছনে যাত্রা শুরু করে। কিছুক্ষন পর কুকুরটি একটি ব্যস্ত রাস্তায় চলে আসে। আর রাস্তার পাশে ড্রেনের সামনে থমকে দাঁড়ায়। তারপর কুকুরটি ড্রেনের মধ্যে তাকায়। তারপর কুকুরটি কিছু অংশ খেয়ে আর বাকি অংশ ড্রেনের মধ্যে ফেলে দেয়। মেয়েটি আরো বেশি অবাক হয়ে যায়। পরের কিছু দিন মেয়েটি কুকুরটির এমন আচরণই দেখতে পায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মেয়েটি এতটা কৌতুহলী হয়ে ওঠে যে,শেষ পর্যন্ত মেয়েটি সেই ময়লা ড্রেনের মধ্যে উঁকি মারে। কিন্তু ড্রেনের মধ্যে সে যা দেখতে পাচ্ছে,তা দেখার জন্য সে প্রস্তুত ছিলোনা। মেয়েটি চমকে ওঠে। এবং সে দ্রুত ফায়ার সার্ভিসে কল করে। আধ ঘন্টার মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের একটি টিম এসে সেই ড্রেনের কাছে উপস্থিত হয়। মেয়েটি সবকিছু সেই ফায়ার সার্ভিস টিমকে খুলে বলে। সেই টিম মেয়েটির কাছ থেকে সবকিছু শুনে বিদ্যুৎ বেগে তাদের কাজে নেমে পড়ে। কিন্তু কুকুরটি সেই টিমকে ওই ড্রেনের কাছ কিছুতেই যেতেই দিচ্ছিলনা। কুকুরটি শেষমেষ কান্না শুরু করে দেয়। কিন্তু দমকল কর্মী কিছুতেই কুকুরটিকে শান্ত করতে পারছিলোনা। মেয়েটি ওই কুকুরটির কাছে যেতে কুকুরটি শান্ত হয়ে যায়। মেয়েটি কুকুরটিকে ড্রেন থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। এর পর ফায়ার সার্ভিস টিম ড্রেন খুলে ফেলে। রাস্তার মাঝখানে ফায়ার সার্ভিস টিম কি করছে তা দেখার জন্য আশেপাশে অজস্র মানুষ জমা হয়। প্রায় ১৫-২০ মিনিট ধরে চলা শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে দমকল কর্মীরা সবার সামনে উন্মোচন করে কুকুরটি ড্রেনের মধ্যে উঁকি দিয়ে কি দেখতো এবং খাবার গুলো কেনো নিচে ফেলেদিত। ফায়ার সার্ভিস টিম ওই ড্রেন থেকে একটি বিড়াল ছানা উদ্ধার করে। কিন্তু ঘটনা এখানেই শেষ নয়। আর ও চারবার দমকল কর্মীরা একটি একটি করে আর ও চারটি বিড়াল ছানা উদ্ধার করে। মেয়েটিও চমকে ওঠে। কারণ সে ড্রেনের মধ্যে উঁকি দিয়ে জীবন্ত কোনো কিছু একটা দেখতে পেয়েছিলো। কিন্তু সে ভাবতে পারেনি যে, সেখানে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছিলো ৫টি বিড়াল ছানা। কুকুরটি বিড়াল ছানা গুলি পেয়ে আনন্দে লেজ নাড়তে থাকে। পরবর্তীতে অ্যানি দমকল কর্মীদের জিজ্ঞাসা করে,যে বিড়ালছানাগুলি কিভাবে এই ড্রেনের মধ্যে আটকা পড়েছিল? দমকল কর্মীরা তখন জানায় বেশ কিছুদিন আগে প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে হয়তোবা বিড়াল ছানাগুলো বৃষ্টির পানিতে এই ড্রেনের মধ্যে ভেসে চলে আসে। এবং ময়লা আবর্জনার মধ্যে আটকে পরে। তখন অ্যানি বুঝতে পারে কুকুরটি খাবারগুলো নিজে না খেয়ে ওই বিড়ালছানাগুলিকে দিয়ে দিতো। যাতে করে উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত বিড়ালছানাগুলো টিকে থাকতে পারে। একটি কুকুরের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দেখে মেয়েটির মন আবেগে ভোরে ওঠে। মেয়েটি দমকল কর্মীদের বলে সে ৫টি বিড়াল ছানার দায়িত্ব নিতে চায়। যতদিন না তারা নিজে নিজে টিকে থাকতে পারে। দমকল কর্মীরা ৫টি বিড়াল ছানাকে ওই মেয়েটির কাছে দিয়ে দেয়। মেয়েটি নির্দ্বিধাদয় ওই ৫টি বিড়াল ছানা এবং ওই কুকুরটিকে তার নিজের বাড়িতে নিয়ে যায়। এবং সেগুলোকে সে নিজের পরিবারের সদস্যদের মতো লালন পালন করতে থাকে। সত্যি বলতে এখান থেকে আমাদের মানুষদের কিছু শিক্ষা নেওয়া উচিত। অনুধাবন করা উচিত যেখানে আমরা মানুষেরা নিজেরা নিজেদের বিপদে এগিয়ে আসিনা, সেখানে একটি কুকুর ভিন্ন প্রজাতির হয়েও ৫টি বিড়াল ছানার জন্য এমন কিছু করতে পারে। তাহলে মানুষ মানুষদের জন্য কি করা উচিত?

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

নতুন জীবন

ভালোবাসার এপিঠ ওপিঠ