কাউকে ছোট ভাবা উচিত না
অল্প বয়সে অধিক টাকার মালিক হওয়ায়,কয়লা ব্যবসাই রাজু আজকাল মানুষকে চোখেই দেখেন না। সারাক্ষন অহংকার লেগেই থাকে। যার কয়লা কারখানায় অভয় নামে এক দিনমজুর কাজ করেন। খুবই সহজ-সরল আর পরিশ্রমী। চেহারায় সারাক্ষন হাসি লেগেই থাকে। একদিন রাজু তার গার্লফ্রেন্ড রানীকে ঘুরে ঘুরে তার প্রজেক্টগুলো দেখছিল। এমন সময় অভয় কাজ শেষে বাড়ি ফিরছিল। ঘাম মুছতে মুছতে যখন অভয় হেঁটে যাচ্ছিল তখন ভুলবশত রানীর সঙ্গে অভয়ের ধাক্কা লাগে। রানী রেগে অভয়ের গালে থাপ্পড় মেরে বললো, তোর কত বড়ো সাহস আমার গায়ে ধাক্কা দিস? অভয় ভয়ে আমতা আমতা করে বলল ম্যাডাম, আমি ইচ্ছা করে ধাক্কা মারিনি। এই কথা শুনে রানী আরো রেগে গিয়ে বলল, চুপকর বেয়াদব। ইচ্ছে করে ধাক্কা দিয়ে আবার মুখে মুখে তর্ক করছিস। তোদের মতো ছোটোলোকদের আমার ভালোকরেই জানা আছে। তারপর রাজুর দিকে তাকিয়ে রানী বললো -এই ছোট লোকের বাচ্চা ময়লা আর শরীরের ঘাম লাগিয়ে আমার জামাটা নষ্ট করে দিল। অথচ তুমি কিছু না বলে তুমি চুপ করে আছো। রাজু তখন অভয়ের গলার গামছা চেপে বললো, তোর সাহস কিকরে হলো আমার গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে অসভ্যতা করার। আজকের পর আর তোর কাজ করতে হবেনা। তুই এই মুহূর্তে চলে যা। অভয় কাঁদতে কাঁদতে বলল এমন করবেন না স্যার। বৌ-বাচ্চা নিয়ে তাহলে না খেয়ে মরব। কিন্তু অভয়ের কোনো কথায় রাজুর কঠিন হৃদয়কে গলাতে পারল না। ধাক্কা দিয়ে অভয়কে কাজ থেকে বের করে দিল। কয়েক বছর পরের ঘটনা........... হাউস বোটের ছাদে বসে নবদম্পতি রাজু আর রানী নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। এমন সময় পেছন থেকে কেউ একজন বললো স্যার, আপনাদের এখানে কোনো সমস্যা হচ্ছেনা তো? পেছন ফিরে তাকাতেই অভয়কে দেখে রাজু হাসতে হাসতে বললো -কি রে তুই? এই বোটের রুম সার্ভিসের চাকরি নিলি কবে থেকে? তোর তো দেখছি ভালোই উন্নতি হয়েছে। আগে লুঙ্গি পরতিস, এখন শার্ট-প্যান্ট পরিস। ভালো তো। কথাটা বলে রাজু আর রানী হাসতে লাগলো। ঠিক সেই সময় পাশদিয়ে হেঁটে যাওয়া একজন রুম সার্ভিস বয় রঞ্জন, রাজু আর রানীর কথাগুলো শুনতে পেলো। সে অবাক হয়ে রাজুর কাছে গিয়ে বললো আপনি কাকে কি বলছেন? আপনি ওনাকে চেনেন? রাজু হেসে বলল ও আগে আমার কয়লা কারখানায় কাজ করতো। রঞ্জন বললো -আগে উনি কি করতো তা আমার জানা নেই। কিন্তু বর্তমানে উনি এই হাউস বোটের মালিক। শুধু এই বোটটাই নয়। এখানে এমন আরো নয়টা বোট আছে, যেগুলোর মালিক উনি। আর আপনি ওনাকে এইভাবে অপমান করছেন। কথাটা শুনে রাজু -রানী দুজনেই অবাক হয়ে যায়। অভয় তখন রঞ্জনকে বলল তুমি এখন থেকে যাও। আমি ওনাদের সঙ্গে কথা বলছি। রঞ্জন চলে যাওয়ার পর অভয় রাজুর দিকে মুচকি হেসে বললো -স্যার, কথায় আছে জগতে যতজন বড়ো হয়েছে তারা সবাই ভাতের কষ্ট দেখেছে। মানে জীবনে কষ্ট পেয়েছে। আপনার কারখানায় কাজ করা অবস্থায় আমার ভাতের কষ্ট হয়নি। নুন কাঁচা লঙ্কা হলেও দুই বেলা ভাত খেতে পেরেছি। জীবনে বড় কিছু চিন্তাও করিনি। শুধু ভেবেছি ডাল -ভাত খেয়ে কোনোরকম জীবন পার হলেই হবে। কিন্তু যখন আপনি কাজ থেকে বের করে দিলেন, তখন ভাতের কষ্টও সহ্য করেছি। আর জীবনে অনেক বড়ো হতে হবে সেই ভাবনাই তখন মাথায় ঢুকেছে। নিজের সততা আর পরিশ্রম দিয়ে আজ আমি এই জায়গায় এসেছি। কথাগুলো শোনার পর রাজু আর রানী মাথা নিচু করে রইল। তখন অভয় রাজুকে বলল -স্যার, আমার বড়ো হওয়ার পেছনে আপনার অবদান সবচেয়ে বেশি। সেদিন যদি আপনি আমাকে বের করে না দিতেন, তাহলে হয়তো আমি আজীবন কয়লা শ্রমিক হয়েই থাকতাম। কখনো হাউস বোটের মালিক হতে পারতাম না। তারপর রানীর দিকে তাকিয়ে বললো ম্যাডাম, মানুষের সঙ্গে মানুষের মতো ব্যবহার করতে শিখুন। মানুষকে ছোটো করে নিজে কখনো বড় হওয়া যায়না। কথাটা বলে অভয় চলে গেল। রাজু তার কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনায় ভুগতে লাগল। নিয়তি কার জন্য কি লিখে রেখেছে সেটা আমি আপনি কেউ জানিনা। আজ আপনি একজনকে গরিব বলে অপমান করছেন, কাল সে আপনার চেয়েও ভালো পর্যায়ে যাবে না তার কি নিশ্চয়তা আছে?
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন