মনের অন্তরালে
রিতু আর মানিক দুজনে পিঠোপিঠি ভাবে মানুষ। মানিকের বাবা চাকরি সূত্রে এখানে এসেছে। আর রিতুর এটা ভাড়া বাড়ি। মানিক রিতুর থেকে তিন বছরের বড়। তাই রিতু মানিককে মানিকদা বলে ডাকে। আর মানিক রিতুকে রিতু বলে ডাকে। দুজনে মারপিট,খেলাধুলো করে। মানিক পড়াশুনোয় ভালো। আর রিতু পড়তে একটুও ভালোবাসেনা। রিতুকে তাই চুলের মুঠি ধরে মারে। তাতে রিতু কিছুদিন রাগ করে আবার সব ভুলে গিয়ে মানিকের সঙ্গে খেলায় মেতে ওঠে। রিতু একটু ডানপিটে স্বভাবের। আর মানিক শান্তশিষ্ট। রিতু সারাদিন পড়াশুনো বাদ দিয়ে শুধু পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ায়। গাছের গোড়ায় গোড়ায় ঘোরে। ফল কুড়োয়। মানিকের বাড়িতে গিয়ে সারাদিন বসে থাকে। মেয়ের এই ডানপিটে স্বভাবের জন্য রিতুর বাবা রিতুকে খুব বকাবকি করে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। একবার রিতুকে তার বাবা ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলো। তাতেও তার কোনো হেলদোল নেই। এবারে রিতুকে মানিকের বাড়িতে যাওয়া বন্ধ করে দিল। আর মানিকেও তাদের বাড়িতে আসতে বারণ করেছে। তাই কেউ কারুর সঙ্গে দেখা করতে পারছেনা। খেলনা বাটি নিয়ে খেলতে পারছেনা। তাই দুজনের মন খুব খারাপ। এর মধ্যে বিপত্তি হলো যে মানিকের বাবা ট্রান্সপার নিয়ে চলে যাচ্ছে। এই শুনে দুজনের মন আরো খারাপ। দেখতে দেখতে সেই দিন চলে এলো। আজ মানিকদের এখান থেকে চলে যেতে হবে। যাওয়ার সময় মানিক এলো রিতুর সঙ্গে দেখা করতে। কিন্তু রিতু মনের কষ্টে রুম থেকে বেরোচ্ছেনা। রিতু আর মানিক দুজন ছোট হলেও ওদের দুজনের দুজনের প্রতি খুব টান। যাওয়ার সময় মানিক জোর করে রুম এর মধ্যে ঢুকলো। দেখলো রিতু কাঁদছে। রিতুর চোখের জল মুছিয়ে বললো কাঁদিসনা রিতু আমি আবার আসবো দেখিস। তুই কিন্তু দুস্টুমি করবিনা। পড়াশুনা করবি। মানিক এতো কথা বলছে কিন্তু রিতু একটাও কথা বলছেনা। একটু পর গাড়ী এলো সেই গাড়িতে উঠে মানিকরা চলে যাচ্ছে। আর রিতু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চোখের জল ফেলছে। মানিকও পেছন ঘুরে দেখছে। আজ সেই ডানপিটে মেয়েটা খুব শান্ত, নির্বাক, লাগছে। যেন মনে হচ্ছে তার ওপর দিয়ে খুব ঝড় বয়ে গেছে। মানিকরা চলে যাওয়ার পর রিতু যেন পুরো পাল্টে গেছে। মাঝে কেটে গেছে অনেক গুলো বছর। প্রায় বারো -তেরো বছর। আজ এক আত্মীয় বিয়েতে মানিকরা আবার এখানে আসছে। রিতুও এখানে উপস্থিত। রিতুর বিয়ে হয়েছে। তাকেও এই বিয়েতে নেমন্ত্রন্ন করা হয়েছে। তাই রিতুও এসেছে। হটাৎ রিতু খেয়াল করলো একটা ছেলে এগিয়ে আসছে আর কাউকে খুঁজছে। রিতু চিনে ফেললো এ তার মানিকদা। তার মানিকদা তাকেই খুঁজছে। রিতু মানিককে দেখে দৌড়ে পালতে গিয়ে রিতুর ধাক্কা লাগলো মানিকের সঙ্গে। মানিক রিতুকে না দেখেই তুলতে গেলো। রিতুকে তুলতে গিয়ে মানিক রিতুকে দেখে চমকে উঠলো। যেখানে রিতুকে দেখে তার খুশি হওয়ার কথা, সেখানে রিতুকে দেখে তার হৃদয় ভেঙে যাচ্ছে। মানিক রিতুর হাত ধরে টানতে টানতে একটা ফাঁকা জায়গায় নিয়ে গেল। মানিক নিয়ে গিয়ে চিৎকার করে বলতে লাগল আমায় চিনতে পারছিস রিতু? কিন্তু রিতুর মুখে কোনো কথা নেই। চুপচাপ নিচের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। মানিক আবার চিৎকার করে বলল -কি হল চুপ কেন? উত্তর দে রিতু। এতগুলো বছর আমি অপেক্ষা করেছি আর তুই? বিয়ে করে নিলি? মনে পড়েনি না তোর মানিকদার কথা? তখন রিতু বলে উঠলো কি করতাম বলতে পারো মানিকদা? তুমি সেই চলে যাওয়ার পর একবারের জন্য যোগাযোগ করেছ? আমি বাবা কে কি বলতাম বলত? যেখানে তোমার কোনো খোঁজ খবর নেই? কোন কথার ভিত্তিতে বিয়ে আটকাতাম বলতে পার মানিকদা? মানিকের মুখ শুকনো করে ছলছল চোখে বলল --আমি ভেবেছিলাম তুই আমার জন্য অপেক্ষা করবি। কিন্তু আমার ভাবনাটাই ভুল। আমি ভাবতাম রিতু শুধু মানিকের তাও ভুল। আমি ভুল ছিলাম। মনে আছে তোর রিতু তুই কোনো ছেলের সঙ্গে কথা বললে, বা কোনো ছেলের সঙ্গে খেললে তোকে কেমন মারতাম আমি? কারন ওই ছোট থেকেই ভাবতাম তুই আমার সঙ্গে ছাড়া কারুর সঙ্গে কথা কেন বলবি? তুই শুধু আমার সঙ্গে কথা বলবি,আমার সঙ্গে খেলবি। তুই শুধু আমার। কিন্তু দেখ আজ সেই তুইটাই আমার নেই। বলতে পারিস কি নিয়ে থাকবো আমি? তোর কোন জবাব নেই। জানিস রিতু তোকে খুব সুন্দর লাগছেরে শাড়ি, শাঁখা, সিঁদুর পরে। আচ্ছা তুই কি এখনো সেরকম দুরন্ত আছিস, যে রিতু আমার ছিল তেমন? আচ্ছা তোর বর আমার মতো তোকে মারেনা বল? খুব ভালোবাসে তাই না? আচ্ছা তোর এই মানিকদার থেকেও বেশি ভালোবাসে? রিতুর মুখে কোনো কথা নেই। দুচোখ বেয়ে শুধু অশ্রু ঝরছে। মানিক বলে উঠলো পালাবি আমার সঙ্গে রিতু? মানিকের কথা শুনে রিতু মানিকের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো। মানিক রিতুর মুখ খানা দুহাতে চেপে ধরে বলল, পারবোনারে রিতু তোকে ছাড়া থাকতে। এই কয়েক বছরে অনেক চেষ্টা করেছি তোর সঙ্গে যোগাযোগ করার, কিন্তু পারিনি। অপেক্ষায় ছিলাম, বড় হলে আমি তোর কাছে ফিরবো। কিন্তু আমি এসে যে তোকে এমন রূপে দেখবো ভাবিনি। রিতু কোনো জবাব দিলোনা, ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলো। মানিক রিতুর দুহাত চেপে বললো চলনা রিতু আমরা পালাই। তোকে ছাড়া যে আমি অসম্পূর্ণ। কি করে বাঁচবো বল? রিতু বলে উঠলো, সমাজ কে কি উত্তর দেবে মানিকদা? সমাজের কাছে আমরা সারাজীবন অপরাধী হয়ে থাকবো। আমার যা হয় হোক কিন্তু আমি তোমাকে কারুর কাছে খারাপ হতে দেবোনা। আমার মনেও চিরদিন তুমি আছো আর থাকবেও। তাইত আমার স্বামীর সঙ্গে সবসময় গন্ডগোল। বনিবনা হয়না। বলতে পারো মানিকদা মনে একজনকে রেখে কি করে আর একজনকে মেনে নেওয়া যায়। মানিক বলে উঠলো সে যা হয় হোক। চল পালাই দুজনে। কিছুক্ষন পর পুরো বিয়ে বাড়িতে দুজনকে খোঁজাখুঁজি চলছে, কিন্তু দুজনের কেউ নেই। দুজন পালিয়েছে আজ দুজন দুজনার হতে। এতো বছরের না পাওয়া আজ পূর্ণতা পেতে চলেছে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন